কলারোয়ার  পৌনে ৪শ বছরের পুরানো পুরাকীর্তি অপরূপ শ্যামসুন্দর মঠ-মন্দির অযত্নে-অবহেলায় অরক্ষিত

আপডেট : July, 3, 2017, 11:05 am

এম এ কাশেম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : প্রকৃতির সাথে পুরাকীর্তি যাদের সমানভাবে আকর্ষণ করে তাদের আসতে হবে সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার সীমান্ত জনপদ সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নে। মধ্যযুগীয় নানা পুরাকীর্তির নিদর্শন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে গোটা সোনাবাড়িয়া জুড়ে। এমনই এক পুরাকীর্তির নাম মঠবাড়ি মন্দির গুচ্ছ। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়  সংরক্ষণ করা গেলে এটি হতে পারে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। কলারোয়া উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৯.৬ কিলোমিটার দূরে সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নের সোনাবাড়িয়া গ্রামে এই মন্দিরটির অবস্থান। প্রায় পৌনে ৪শ বছরের পুরানো ৬০ ফুট উঁচু টেরাকোটা ফলক খচিত পিরামিড আকৃতির এই মঠ-মন্দির প্রাচীন স্থাপত্যের অপরূপ নিদর্শন হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। তবে জরাজীর্ণ ও ভগ্নপ্রায় এই ঐতিহাসিক মঠ-মন্দিরটি দ্রুত সংরক্ষণ করা হলে একটি জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যাবে, যা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এ ছাড়া মঠ-মন্দিরের পাশে অবস্থিত বিশাল কষ্টি পাথরের শিব মূর্তি। এক সময় ভক্তদের আনাগোনায় মুখোরিত থাকতো এলাকাজুড়ে। ঐতিহাসিক এই নিদর্শনটি সংস্কার না করায় জরাজীর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে।

পত্নতাত্বিক অধিদপ্তরের সাবেক উপ-পরিচালক মোঃ মোশারফ হোসেনের লেখা  পত্নতাত্বিক জরিপ প্রতিবেদন বৃহত্তর খুলনা’ বইয়ের ৯৪ পৃষ্ঠার দ্বিতীয় কলামে উল্লেখ করা হয়েছে, এই মন্দির ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে জনৈক হরিরাম দাশ (মতান্তরে দুর্গাপ্রিয় দাশ) নির্মাণ করেছিলেন। যেটি সতীশ চন্দ্র মিত্রের বইয়েও লেখা রয়েছে। এই পুরাকীর্তির সবচেয়ে বড় এর ত্রিতলবিশিষ্ট পত্নতাত্বিক মন্দির। যেটি ‘শ্যামসুন্দর মন্দির’ নামে পরিচিত। এর সাথে লাগোয়া রয়েছে দুর্গামন্দির ও শিবমন্দির। এই মন্দিরগু”েছর দক্ষিণে একটি অসম বাহুবিশিষ্ট চৌকো দিঘি আছে। শ্যামসুন্দর মঠের নিচের তলা ১০.৮২ মি./৩৫ফু.-৬ ই. বর্গাকার ভিত পরিকল্পনায় নির্মিত। মঠের দ্বিতলের মাপ ১০ মি./৩২ফুট.-১০ইঞ্চি. এছাড়া ৯.৯৮ মি./৩২ ফু.-৯ ই. এবং ত্রিতল ৭.৪৬মি./২৪ ফু.-৬ ই. ও ৭.১৬ মি./২৩ ফু.-৬ ই.। ফলে মন্দিরটি একটি পিরামিড আকৃতি ধারণ করেছে। দক্ষিণমুখি এই মন্দিরের নিচের তলার ভিতরের অংশে চারটি ভাগ রয়েছে। প্রথম ভাগের চারপাশে রয়েছে ঘূর্ণায়মান টানা অলিন্দ। দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে ৬.১৪ মি./২০ ফু.-২ ই.পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা এবং ১.৩২ মি./৪ ফু.-৫ ই. চওড়া একটি মন্ডপ। তৃতীয় ভাগের পশ্চিম পাশের কোঠা এবং মাঝের কোঠাটির উত্তরে একটি করে প্রকোষ্ঠ রয়েছে। পূর্বাংশের কোঠাটির পিছনে রয়েছে একটি অলিন্দ, যেখানে দ্বিতল ভবনে ওঠার সিঁড়ি রয়েছে।

ধারণা করা যায়, পূর্ব ও পশ্চিম কোঠা দুটিতে সংরক্ষিত মূর্তির উদ্দেশ্যে মন্দিরটি নিবেদিত ছিল। দ্বিতলে রয়েছে একটি দক্ষিণমুখি কোঠা। এর পরিমাপ ২.২৮ মি./৭ফু.-৬ ই. ও ১.৯৮মি./৬ ফু,-৬ ই.। ত্রিতল ভবনটি তুলনামূলক ছোট। এর দক্ষিণ দিকের মধ্যের খিলানটির ওপর একটি পোড়ামাটির ফলক রয়েছে। মোশারফ হোসেনের ওই জরিপ বইয়ে আরো বলা হয়েছে, শ্যামসুন্দর মঠের নিচে রয়েছে ৪৫.৭ সেমি./১ ফু.-৬ ই. উঁচু নিরেট মঞ্চ। এর প্রত্যেক তলার ছাদপ্রান্ত ধনুকের মত বাঁকা। কোণগুলো কৌণিক। এগুলোর ছাদের ওপর ক্রমান্বয়ে ধাপে ধাপে ঊর্ধমুখি গম্বুজ রয়েছে। আর মাঝখানে তুলনামূলক বড় একটি রত্ন রয়েছে। তাই এটি ‘নবরত্ন স্মৃতি মন্দির’ নামে পরিচিত। নবরত্ন বা শ্যামসুন্দর মঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে আরও একটি দক্ষিণমুখি মন্দির আছে। যেটি ‘দুর্গা মন্দির’ নামে পরিচিত। শ্যামসুন্দর মন্দিরের গা ঘেঁষে পূর্বমুখি মন্দিরটিতে ৯১.৪৩ সেমি./৩ ফুট উঁচু একটি কালো কষ্টি পাথরের শিবলিঙ্গ ছিলো। কয়েক কোটি টাকা দামের এই কষ্টি পাথরের শিবলিঙ্গটি চোরাকারবারীরা চুরি করে নিয়ে যায়। বর্তমানে সেখানে সিমেন্ট দিয়ে নতুন একটি শিবলিঙ্গ ভক্তদের জন্য বানানো হয়েছে। এর ওপর একটি ভাষ্য ফলক পাঠোদ্ধার অনুপযোগী অবস্থায় সংস্থাপতি আছে। এর ছাদ চৌচালা, কার্ণিশ ধনুকাকারে বাঁকা এবং কোণগুলো কৌণিক। এটি ‘অন্নপূর্ণা মন্দির’ নামে পরিচিত। মন্দির গুচ্ছের সব ক’টি ইমারতে ২২.৮৫ সেমি. ২০.৩১ সেমি. ২.৫৩ সেমি.(৯ই. ৮ই. ও ১ই.) পরিমাপের ইট ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো গাঁথা হয়েছে চুন ও সুরকি মিশ্রিত মসলা দিয়ে। বর্তমানে এ মন্দিরগু”ছ পরিত্যক্ত অবস্থায়রয়েছে। এই মঠের পাশে আরও ৮ টি (মতান্তরে ১০টি) মন্দির ছিল।

এলাকাবাসীর মতে, রামহংস পরমানন্দ এক সময় মন্দিরগুলো পরিদর্শনে এসেছিলেন। মঠ মন্দিরগুচ্ছের অল্প দক্ষিণে ‘জমির বিশ্বাসের পুকুর’ নামে যে জলাশয়টি আছে তার পাকাঘাটে ব্যবহৃত ইটের সাথে ‘অন্নপূর্ণা মন্দির’ এর ইটের মিল পাওয়া যায়। তাতে ধারণা করা হয় পুকুরটি একই সময়কালের নিদর্শন। বর্তমানে এই ঐতিহাসিক পুকুরটি বিষমবাহুর আকার ধারণ করেছে।

২০১০ সালের জানুয়ারীতে এই শ্যামসুন্দর মঠ দেখতে সোনাবাড়িয়া এসেছিলেন প্রতœতত্ত্ব বিভাগের সাবেক উপ-পরিচালক ও পুরাতত্ত্ব বিষয়ক লেখক মোঃ মোশারফ হোসেন। সাথে ছিলেন বিশিষ্ট লেখক জ্যোতির্ময় মল্লিক এবং খুলনা জাদুঘরের একটি টিম। পরিদর্শনকালে তারা সংশিষ্ট এলাকার মানুষের সাথে কথা বলেন। এ সময় এলাকাবাসী প্রতœতত্ত্ব বিভাগ মন্দিরগু”েছর সংরক্ষণের দায়িত্ব নেয়ার আবেদন করেছিলেন। কিš‘ পরিতাপের বিষয় হলো খুলনা জাদুঘরের টিম পরিদর্শনের ৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এ মঠ-মন্দিরটি আজও সংরক্ষণ করা হয়নি। তবে গত দুই মাস আগে খুলনা প্রতœতত্ত্ব বিভাগের কয়েকজন কর্মচারী এসে মন্দিরের পাশে ছোট একটি সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে। যাতে লেখা আছে এই মন্দিরের কোন সম্মতি বিনষ্ট না করার জন্য। এলাকাবাসীর মতে  সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে মঠটি সংরক্ষণ করা গেলে এটি হতে পারতো সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ সকল মানুষের কাছে দর্শনীয় ¯’ান ও দেশের আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।

এ বিষয়ে সোনাবাড়ীয়া এলাকার ¯’ায়ী বাসিন্দা কলারোয়া সরকারি কলেজের প্রভাষক (অবসপ্রাপ্ত) বাবু সুপ্রশাদ (মোবা: ০১৭৬৭-৪৬০২৫০) জানান, ঐতিহাসিক এ প্রতœতত্ত্বটি সংস্কার ও দেখার কোন মানুষ না থাকায় ২৫/২৬ বছর আগে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের শিবলিঙ্গটি চুরি হয়। সে সময় এ ঘটনায় কলারোয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করা হয়েছিলো। তবে সেটি আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে সনাতন ধর্মাবলীদের পূজা করার জন্য সিমেন্ট দিয়ে একটি শিবলিঙ্গ তৈরী করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই মন্দিও গু”ছ দেখার জন্য ¯’ানীয় পর্যায়ে কয়েকটি গ্রামের মানুষদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সভাপতি তার ছোট ভাই দেব প্রসাদ। তিনি বলেন, তিনি নিজে কয়েকবার খুলনা প্রতœতত্ত বিভাগ অফিসে যোগাযোগ করেছেন তাবে কর্মকর্তারা এই বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে সংরক্ষন করা হবে বলে জানিয়েছে। তিনি কর্মকর্তাটির নাম বলতে পারেনি। তিনি মঠবাড়ি মন্দির গু”ছটি ধংশ হওয়ার আগে এটি সংরক্ষন করার জোর দাবি জানান।

কলারোয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বিপ্লব কুমার নাথ জানান, আমি এই থানাতে সম্প্রতি যোগদান করেছি। কষ্টি পাথরের শিবলিঙ্গ চুরির বিষয়ে আমার জানানেই। তবে বিষয়টি তিনি তদন্ত করে দেখবেন বলে জানান।

কলারোয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফিরোজ আহম্মেদ স্বপন  (মোবা: ০১৭১১-২৭৯৫৪৫)  বলেন, প্রায় ৪’শ বছরের পুরানো এই পূরাকীর্তিটি কলারোয়া উপজেলার ইতিহাস, সংস্কৃতির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেণ, জরাজীর্ণ অব¯’ায় পড়ে থাকা এই মঠ-মন্দিরটি সংস্কার ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে তৈরীর জন্য একাধিক বার সংস্কৃতি মন্ত্রলায়, পর্যটন মন্ত্রলায়সহ বিভিন্ন দপ্তরে জানিয়েছেন কিš‘ আজ পর্যন্ত কোন মন্ত্রনালয় এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহন করেননি। তিনিও কলারোয়া উপজেলার ঐতিয্য শ্যামসুন্দর মঠ-মন্দিরটি রক্ষা করে পুরানো এই প্রতœতত্বকে সংস্কার ও কলারোয়া উপজেলাকে পর্যটন এলাকা বানানোর জন্য সরকারের উর্ধতন কতৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায় (মোবা: ০১৭০৯-৩১৯৭৩৯) জানান, কলারোয়ার এই শ্যামসুন্দর মঠ-মন্দিরটি বর্তমানে প্রতœতত্ব বিভাগের অধীনে থাকায় আমরা ¯’ানীয় প্রশাসন ই”ছা থাকা সত্বেও এটি সংরক্ষনের জন্য কাজ করতে পারছিনা। এ সময় তিনি বলেন, খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আব্দুস সামাদ স্যার পুরানো এই পূরাকীতিৃটি রক্ষার জন্য বলেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরো বলেন, এটি সংস্কার করা জরুরী প্রয়োজন, কেন না সংরক্ষন না করায় এটি অতি দ্রুত হারিয়ে যেতে বসেছে। তিনি দাবি কওে বলেন, এ বিষয়ে প্রতœতত্ব বিভাগ যদি আমাদেন সংরক্ষনের অনুমোতি প্রদান করেন তাহলে আমরা ¯’ানীয় প্রশাসন জরুরী পদক্ষেপ নেব। এছাড়া প্রতœতত বিভাগ আমাদের কোন সহযোগিতা চাইলে আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দেশের এই সম্পদ রক্ষা করার জন্য সার্বিক সহযোগিতা করতে প্র¯‘ত রয়েছি।

Facebook Comments

103331
Total Users : 3331